মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ভাষা ও সংস্কৃতি

সাহিত্য ও সংস্কৃতি চেতনার বহিঃপ্রকাশ। এই প্রকাশ নানাভাবে নানা খাতে প্রবাহিত হয়। সাহিত্য সংস্কৃতির ধারা একদিনে  গড়ে উঠে না। যুগ-যুগামত্মরের মিলন ও একাত্মতা একে সার্থক ও সমম্বিয়ত করে। বিভিন্ন জেলা ও মহকুমায় তা লক্ষ্য করা যায়। সাহিত্যের ক্ষেত্রে সিরাজগঞ্জের সম্পর্ক রংপুর, বগুড়া, পাবনা সদর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর ও খুলনার সংগে। যাতায়াত ও ব্যবসা বাণিজ্য জনিত কারনেই এই যোগাযোগ চলছে বা চলে আসছে। অধুনা রাজশাহী ও নবাবগঞ্জের সাথে রেল সংযোগ থাকায় যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে। রংপুর, বগুড়া, পাবনা ও কুষ্টিয়ার লোক সাহিত্য, ফকিরী, মুর্শিদী, মারফতী গান-গজল, লোক কাহিনী প্রভৃতির মধ্যে একটা স্বতন্ত্র ভাব লক্ষ্য করা যায়। এই স্বতন্ত্রতা বরেন্দ্রভূমি রাজশাহী-নাটোরের প্রভাবমুক্ত। এই ভাবধারা পাশাপাশি চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। রংপুর, বগুড়া, পাবনা, কুষ্টিয়া বলয়ের সাহিত্য সংস্কৃতি ভিন্ন গতিপ্রকৃতি বিশিষ্ট, ইসলামী চিমত্মা ধারার প্রতিফলন এতে বেশী স্পষ্টতর হয়। সাহিত্য, সংস্কৃতির এই প্রবাহ যদিও তর্কাতীত নয়, তবু দৃশ্যমান ও প্রকট স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্য স্বীকার্য সত্যরূপে প্রতীয়মান। সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্যের মধেই সম্বনয় সাধন প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে ও থাকা দরকার। সিরাজগঞ্জের নাটকের স্থান পূর্ব থেকেই উন্নত, এখনও এখানে নাটক, যাত্রা অভিনীত হয় বেশী। কলিকাতার বিখ্যাত নটরাজ ছবি বিশ্বাসের বাড়ী সিরাজগঞ্জ থানার বাগবাটি গ্রামে ছিল। প্রখ্যাত আইনজীবি অমিত্মম বাবু ছিলেন নাটক প্রিয়। এখনও বহু নাট্যকার বর্তমান। পূর্বের নাট্যশালা এখন পৌর মিলনায়তনে পরিবর্তিত হয়েছে।  এখানেও নাটক মঞ্চস্থ হয়। অন্যান্য স্থানের মত সিরাজগঞ্জের কবিতা চর্চা অনেক বেশী। যখনই কোন পর্ব আসে, তখন কবিতার ঢল নামে। এখন ছন্দের প্রতি অনুরাগ নাই। আধুনিক কবিতার প্রতি অনুরাগ বেশী। তদুপরি কবিতার অবোধ্য, দূর্বোধ্য ভাষা ও শব্দ সংযোজনের প্রবণতা লক্ষ্যণীয় সিরাজগঞ্জের সাহিত্য সংস্কৃতির ধারা প্রবাহমান রাখতে চেষ্টা করছে শহর ও পল্লীর বিভিন্ন সাহিত্য-পত্র পত্রিকা, সাময়িকী এবং প্রবীণ ও তরুন কবি সাহিত্যিকগণ ও শিল্প সাহিত্য সংবাদ ও গোষ্ঠী। তন্মধ্যে যমুনা সাহিত্য গোষ্ঠী, উদিচী, বাস্কার শিল্পী চক্রের নাম উল্লেখযোগ্য।


সিরাজগঞ্জের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদগণ হলেন :

যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী (১৮৫৫-১৯২০)
সিরাজগঞ্জ জেলা শহর থেকে মাত্র সাত আট মাইল দক্ষিণে কামারখন্দ উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন।  তাঁর পিতার নাম  কৃষ্ণ চন্দ্র চক্রবর্তী ও মাতার নাম দূর্গা সুন্দরী। তিনি খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি গণিত শাস্ত্রে কৃতিত্বের সঙ্গে এম এ ডিগ্রী হাসিল করে প্রথমে কলকাতা সিটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং এখান থেকেই পাটিগণিত রচনায় মশগুল হন। আলীগড় মুসলিম বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা স্যার সৈয়দ আহমদ যাদব চন্দ্রকে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাটিগণিতের অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেন এবং নিজ বাসভবনের কাছেই যাদব চন্দ্রের জন্য একটি বাংলো বাড়ী ভাড়া করে দেন। যাদব পরে আলীগড় কলেজে অধ্যাপনা কালে ১৮৯০ সালে ইংরেজিতে তার পাটিগণিত বইটি প্রকাশ করেন। অল্পকালের মধ্যেই সেই পাটিগণিত বাংলা, উর্দু, হিন্দী, আসামী, মায়াবী, নেপালী প্রভৃতি ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে প্রচলিত হয়। ১৯১২ সালে যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী বীজগণিত প্রকাশ করেন। সেই বীজগণিতও একই রকম জনপ্রিয়তা লাভ করে। তিনি ১৯১৬ সালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে অবসর গ্রহণ করে সিরাজগঞ্জে দেশের বাড়ীতে ফিরে আসেন। ইতঃপূর্বে ১৯০১ সালে তিনি সিরাজগঞ্জ শহরের ধানবান্ধিতে একটি পাকা ইমারত তৈরী করে ছেলেমেয়েদেরকে এখানে রেখেই পড়াশোনার বন্দোবসত্ম করেছিলেন। অবসর জীবনে তিনি সেই বাড়ীতে এসেই বসবাস করতে থাকেন। তিনি গ্রামের বাড়ী তেঁতুলিয়ায় একটি পাকা মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। ১৯২০ সালের ২৬ নভেম্বর ৬৯ বছর বয়সে কলকাতার নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

মোহাম্মদ নজিবর রহমান, সাহিত্যরত্ন  (১৮৬০-১৯২৩)


তিনি ছিলেন একজন নামকরা ঐপন্যাসিক। তৎকালীন পাবনা জেলার শাহজাদুরের চরবেলতৈল গ্রামে তাঁর জন্ম। ঢাকার নর্মাল স্কুল থেকে পাস করে প্রথমে তিনি জলপাইগুড়ির একটি নীলকুঠিতে চাকরি করেন; পরে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে সিরাজগঞ্জের ভাঙ্গাবাড়ি মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়, সলঙ্গা মাইনর স্কুল ও রাজশাহী জুনিয়র মাদ্রাসায় চাকরি করেন। কিছুদিন তিনি ডাকঘরে পোষ্ট মাস্টারের দায়িত্বও পালন করেন। নজিবর রহমান ১৮৯২ সালে নিজ গ্রামে একটি মকতব স্থাপন করেন যা পরবর্তীকালে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। তিনি যখন সলঙ্গায় শিক্ষকতা করতেন তখন সেখানকার হিন্দু জমিদার গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ করলে তিনি তার প্রতিবাদ করেন, এর ফলে সে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয়। নজিবর রহমান র (১৮৮০-১৯৩১) প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায় সাহিত্যকর্মে ব্রতী হন। তাঁর প্রথম সামাজিক  আনোয়ারা (১৯১৪) লিখে তিনি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর অন্যান্য উপন্যাস হলো: প্রেমের সমাধি (১৯১৫), চাঁদতারা বা হাসান গঙ্গা বাহমণি (১৯১৭), পরিণাম (১৯১৮), গরীবের মেয়ে (১৯২৩), দুনিয়া আর চাইনা (১৯২৪) ও মেহেরুন্নিসা। বিলাতী বর্জন রহস্য (১৯০৪) ও সাহিত্য প্রসঙ্গ (১৯০৪) তাঁর অপর দুটি আলোচনা গ্রন্থ। নজিবর রহমান তাঁর উপন্যাসে গ্রামীণ মুসলিম পরিবারের অন্তরঙ্গ ছবি তুলে ধরতে সক্ষম হন। সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ‘সাহিত্যরত্ন’ উপাধি লাভ করেন। ১৯২৩ সালের ১৮ অক্টোবর রায়গঞ্জের হাটিকুমরুল গ্রামে তাঁর মৃত্যু হয়।

 

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৮০-১৯৩১)

সিরাজগঞ্জের বিশিষ্ট লেখক, বাগ্মী এবং কৃষক নেতা। তিনি সিরাজগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন (এ কারণেই তিনি তাঁর নামের সঙ্গে ‘সিরাজী’ উপাধি যুক্ত করেন)। পিতা আব্দুল করিম খন্দকার (১৮৫৬-১৯২৪) ইউনানী (ভেষজ ঔষধ) চিকিৎসক ছিলেন। আর্থিকভাবে তিনি তেমন স্বছল ছিলেন না। তাই যথেষ্ট মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও সিরাজীর কলেজে পড়া সম্ভব হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করতে না পারলেও তিনি মেধা চর্চা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। সিরাজী লেখালেখি করে এবং সভা সমিতিতে বক্তৃতা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর লেখা ও বক্তৃতার প্রধান বিষয়বস্ত ছিল বাংলার অনগ্রসর মুসলিম সমাজকে জাগিয়ে তোলা। বাগ্মী হিসেবে তিনি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিলেন। মুসলমানদের স্বার্থের কথা বললেও তিনি সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, সম্পদের সুসম বন্টনের মধেই হিন্দু-মুসলমানের সৌহার্দ নির্ভর করছে। ইসমাইল হোসেন সিরাজী একই সাথে বেশ কিছু সংগঠন ও দলের সদস্য ছিলেন, যেমন অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস, জামিয়াত-ই-উলামা-ই-হিন্দ, ’স্বরাজ পার্টি ও কৃষক সমিতি। শিবলী নোমানী (১৮৫৭-১৯১৪) ও মুহম্মদ ইকবালের (১৮৭৬-১৯৩৮) প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছিল সিরাজীর ওপর। তাঁদের মতো তিনিও অনুভব করেছিলেন যে ধর্মীয় ও সেক্যুলার চিন্তার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে একদিকে যেমন ভারতীয় মুসলমান সম্প্রদায়কে জাগিয়ে তোলা সম্ভব, অন্যদিকে তেমনি সম্ভব অবনতিশীল হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে উন্নয়ন। সমসাময়িক পত্রিকা আল-এসলাম, ইসলাম প্রচারক, প্রবাসী, প্রচারক, কোহিনুর, সোলতান, মোহাম্মাদী, সওগাত, নবযুগ ও নবনূর প্রভৃতিতে সিরাজীর লেখা প্রকাশিত হতো। তাঁর অধিকাংশ লেখাতেই ইসলামি ঐতিহ্য সংস্কৃতি ও উত্তরাধিকারকে উদ্দীপ্ত করে তোলার প্রয়াস ছিল। তিনি আধুনিক শিক্ষা ও সত্যিকার ইসলামি শিক্ষার পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। ইসমাইল হোসেন সিরাজী সিরাজগঞ্জে কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি জমিদার ও মহাজন বিরোধী আন্দোলনে কৃষকদের সংগঠিত  করেন। ইসমাইল হোসেন সিরাজীর কাব্যগ্রন্থগুলি হচ্ছে অনল প্রবাহ (১৯০০), আকাংখা (১৯০৬), উচ্ছ্বাস (১৯০৭), উদ্বোধন (১৯০৭), নব উদ্দীপনা (১৯০৭), স্পেন বিজয় কাব্য (১৯১৪), সঙ্গীত সঞ্জীবনী (১৯১৬), প্রেমাঞ্জলি (১৯১৬)। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হচ্ছে রায়নন্দিনী (১৯১৫), তারাবাঈ (১৯১৬), ফিরোজা বেগম (১৯১৮) ও নুরুদ্দীন (১৯১৯) ইত্যাদি।

 

রজনীকান্ত সেন  (১৮৬৫-১৯১০)

তিনি ছিলেন খ্যাতনামা কবি, গীতিকার ও সঙ্গীতশিল্পী । ১৮৬৫ সালের ২৬ জুলাই সিরাজগঞ্জ জৈলার ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা গুরুপ্রসাদ সেন ছিলেন সেন ছিলেন একজন সঙ্গীতজ্ঞ ব্যক্তি। রজনীকান্ত কুচবিহার জেনকিস স্কুল থেকে এন্ট্রান্স (১৮৮৩), রাজশাহী কলেজ থেকে এফ, এ এবং কলকাতা সিটি কলেজ থেকে বি,এ ও বি,এল (১৮৯১) ডিগ্রী লাভ করেন। এরপরই তিনি রাজশাহী কোর্টে ওকালতি শুরু করেন। কিছুদিন তিনি নাটোর ও নওগাঁয় অস্থায়ী মুন্সেফও ছিলেন। রজনীকান্ত শৈশব থেকেই পিতার নিকট সঙ্গীত শেখেন এবং মাত্র পনেরো বছর বয়সে কালীসঙ্গীত রচনা করে কবিত্বশক্তির পরিচয় দেন। রাজশাহীতে অক্ষয়কুমার মৈত্রের বাড়িতে তিনি স্বরচিত গান পরিবেশন করতেন। সেখানকার উৎসাহ নামক মাসিক পত্রিকায় তাঁর রচনা প্রকাশিত হতো। তিনি কবিতাও রচনা করতেন এবং ‘কান্তকবি’ নামে খ্যাত ছিলেন।  তাঁর কবিতা ও গানের বিষয়বস্ত্ত ছিল প্রধানত ভক্তি ও দেশপ্রেম। তাঁর রচিত গন্থগুলি হলো : বাণী (১৯০২), কল্যাণী (১৯০৫), অমৃত (১৯১০), অভয়া (১৯১০), আনন্দময়ী (১৯১০), বিশ্রাম (১৯১০), সম্ভাবকুসুম (১৯১৩), শেষদান (১৯১৬), পথচিন্তামণি এবং অভয় বিহার। এগুলোর মধ্যে বাণী ও কল্যাণী গানের সঞ্চয়ন, পথচিন্তামণি একটি কীর্তনগ্রন্থ, আর অভয় বিহার একটি গীতিকাব্য। ১৯১০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়।
 
মোহাম্মদ বরকতুত্মল্লাহ (১৮৯৮-১৯৭৪)
লেখক, প্রবন্ধকার। ১৮৯৮ সালের ২ মার্চ তৎকালীণ পাবনা জেলার শাহজাদপুরের ঘোড়াশালে তাঁর জন্ম। তিনি শাহজাদপুর হাই স্কুল এবং রাজশাহী কলেজে অধ্যয়ন করেন। তারপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  বি.এ (অনার্স, ১৯১৮) এবং প্রেসিডেন্সীকলেজ থেকে এম এ (দর্শন, ১৯২০) ও আইন পরীক্ষায় (১৯২২) পাস করেন। অতঃপর বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি চাকরিজীবনে প্রবেশ করে একে একে আয়কর অফিসার (১৯২৩), ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট (১৯২৪), ম্যাজিস্ট্রেট (১৯৩০), সাব-ডিভিশনাল অফিসার (১৯৩৬) এবং কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং- এ সহকারী সেক্রেটারী (১৯৪৪) হন। সিভিল সাপ্লাই  বিভাগেও তিনি কিছুদিন চাকরি করেন। পাকিস্তান হওয়ার পর তিনি ফরিদপুর, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক (১৯৪৮-৫১) এবং পর্ব পাকিস্তান সরকারের ডেপুটি সেক্রেটারী (১৯৫১-৫৫) ছিলেন। অবসর গ্রহণের পর ১৯৫৫-৫৭ পর্যন্ত বাংলা একাডেমীতে তিনি বিশেষ কর্মকর্তা হিসেবে প্রথম পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। বরকতুল্লাহ সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাও করতেন। আধুনিক বাঙালি মুসলমান লেখকদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম দাশট্টনিক ভাবনাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ রচনায় আত্ননিয়োগ করেন।  তাঁর গ্রন্থসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :  পারস্য  প্রতিভা (২ খল্প ১৯২৪, ১৯৩২), মানুষের ধর্ম (১৯৩৪), কারবালা ও ইমামবংশের ইতিবৃত্ত (১৯৫৭), নয়া জাতির সৃষ্টা হযরত মুহম্মদ (১৯৬৩), বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ধারা (১৯৬৯) ইত্যাদি। দর্শনের বিভিন্ন দুরূহ বিষয় সাবলীল বাংলা গদ্যে প্রকাশ করে তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তিনি প্রবন্ধ সাহিত্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬০), নয়া জাতির স্রষ্টা হযরত মুহম্মদ গ্রন্থের জন্য দাউদ পুরস্কার (১৯৬৩) লাভ করেন এবং পাকিস্তান সরকার কর্তৃক সিতারা-ই-ইমতিয়াজ (১৯৬২) পদক ও প্রেসিডেন্ট  এওয়ার্ড অফ পারফরমেন্স (১৯৭০) সম্মানে ভৃষিত হন। ১৯৭৪ সালের ২ নভেম্বর ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।
 
আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন (১৯৩০-১৯৯৮)
তিনি ছিলেন জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক, শিক্ষাবিদ ও প্রশাসক। আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফদ্দিন ১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি সিরাজগঞ্জ জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে এম, এস সি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা বিষয়ে ১৯৬০ সালে এম, এ ও ১৯৬২ সালে পিএইচ, ডি ডিগ্রী লাভ করেন। বাংলাদেশ সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন সচিব আল-মুতী শরফুদ্দিনের কর্মজীবন শুরু হয় সরকারি কলেজের একজন শিক্ষক হিসেবে। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষক-প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, জনশিক্ষা পরিচালক (ডিপিআই), বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক কাউন্সিলর, শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি এডিবি-ইউএনডিপি অর্থায়নকৃত মাধ্যমিক বিজ্ঞান শিক্ষা প্রকল্পের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন।
গোলাম মকসুদ  হিলালী   (১৯০০-১৯৬১)
তিনি ছিলেন সিরাজগঞ্জের অন্যতম শিক্ষাবিদ, ভাষাবিদ ও সাহিত্যিক। ১৯০০ সালের ৩০ নভেম্বর সিরাজগঞ্জের ফুলবাড়িতে তাঁর জন্ম। তিনি কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে এম, এ (ফারসি/১৯২৪ ও আরবি/ ১৯৩২), বি,এল (১৯২৭) ও ডি.ফিল (১৯৪৯) ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘ইরান ও ইসলাম: তাদের পারস্পরিক প্রভাব। গোলাম মকসুদ টাঙ্গাইল জেলার করটিয়া কলেজে ফারসি ভাষার অধ্যাপক (১৯২৬) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন; তারপর তিনি বিভিন্ন সময়ে কৃষ্ণনগর কলেজ, কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও রাজশাহী  কলেজে অধ্যাপনা করেন। মাঝে দুই বছর (১৯২৮-১৯৩০) তিনি পাবনা জজ কোর্টে ওকালতি করেন। ১৯৪০-৪১ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্কুলসমূহের সহকারী পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেন।
 
ফতেহ  লোহানী
সিরাজগঞ্জ থানার কাওয়াকোলা গ্রামে আবু লোহানীর আদি বাসস্থান ছিল। কিন্তু যমুনার ভাঙ্গনে কাওয়াকোলা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে উল্লাপাড়া থানার শোনতলা গ্রামে তারা বসতি স্থাপন করেন। আবু লোহানী -এর বড় ছেলে ফতেহ লোহানী একাধারে সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক, অভিনেতা, নাট্যাভিনেতা ও ঢাকা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত কথিকা লেখক ছিলেন। ফতেহ লোহানী কলকাতার নাট্যাঙ্গনে অভিনয় করেছেন এবং ‘কিরন কুমার’ ছদ্ম নাম নিয়ে চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। সাবেক পূর্ব পাকিসত্মানে আব্দুল জববার খানের পাশাপাশি ফতেহ লোহানীও চলচ্চিত্রের গোড়াপত্তনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। ফতেহ লোহানীর পরিচালিত ‘আসিয়া’ ছায়াছবিটি রাষ্ট্রীয় পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছিল। ফতেহ লোহানীর কবিতা ছিল খুবই হৃদয়গ্রাহী। তাঁর সম্পাদিত ‘অগত্যা’ সাহিত্য মাসিকটি অল্প দিনের মধ্যে দেশব্যাপী পরিচিত হয়ে উঠে। মওলানা আকরম খাঁর মাসিক ‘মোহাম্মদী’, কবি আবদুল কাদিরের সরকারী মাসিক পত্রিকা ‘মাহে-নও’ ইত্যাদির পাশে ফতেহ লোহানীর মাসিক ‘অগত্যা’ সম্পূর্ণ আলাদা ইমেজ নিয়ে পাঠক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তবে ফতেহ লোহানীর কোন বই প্রকাশিত হয়নি।
মকবুলা  মঞ্জুর
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ থানার মুগবেলাই গ্রামে ১৯৩৮ সনে মকবুলা মঞ্জুর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন প্রখ্যাত উপন্যাসিক, ছোট গল্পকার ও নাট্যকার। তার রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে আর এক জীবন (উপন্যাস), নীলকণ্ঠী, পঞ্চকন্যা প্রভৃতি। রেডিও ও টিভির জন্য কথিকা ও নাটক রচনায় তিনি সবসময় নিয়োজিত ছিলেন। সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ড. মোখলেছুর রহমান, পাক বাংলাদেশের ফোক-ফ্যান্টাসী চিত্র পরিচালক ইবনে মিজান (মন্টু) ও বাংলাদেশের সৎ চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত লেখক, সাংবাদিক আজিজ মেছের (টুংকু) মকবুলা মঞ্জুরের সহোদর ভাই।

ফজলে লোহানী

১৯২৭ সালে উল্লাপাড়া থানার শোনতলা গ্রামে প্রখ্যাত আবু লোহানীর ঔরষে ফতেহ লোহানী, ফজলে লোহানী, কামাল লোহানী ও হুসনা বানু প্রমুখ প্রতিভাশালী ছেলেমেয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের টিভি রিপোর্টার হিসাবে ফজলে লোহানী মতো প্রতিভার সাক্ষাৎ আর কখনো মিলবে কিনা সন্দেহ আছে। ‘‘যদি কিছু মনে না করেন’’ এই শিরোনামে প্রতি মাসে পাক্ষিক দুটি টিভি রিপোর্টিং দেখার জন্য লক্ষ লক্ষ টিভি দর্শক বিপুল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতো। ভয়েস অব আমেরিকা ও রয়টারের জগত বিখ্যাত  টিভি রিপোর্টারদের সমকক্ষ ফজলে লোহানী অপূর্ব ভঙ্গিমায় টিভি পর্দায় হাজির হয়ে দর্শকবৃন্দের বিপুল করতালির মধ্যে কখনো হাসি আনন্দ, কখনো বেদনা ভারাক্রামত্ম টিভি রিপোর্টিং এর মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখতেন। তার অপর একটি টিভি রিপোটিং বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মওলানা ভাসানী যখন মহীপুরে বিশাল প্রজা সম্মেলন করছিলেন, তখন ফজলে লোহানী গিয়েছিলেন সেই মহীপুরে, মওলানা ভাসানাীর সাক্ষাৎকারের উপর টিভি রিপোর্টিং করবার জন্য। পরে ফজলে লোহানীর সেই রিপোর্টটি ‘মহীপুরের প্রামত্মরে’ নামে পত্রিকায় প্রকাশিত হলে বিভিন্ন মহলে তা ব্যাপক আলোচনার বস্ত্ততে পরিণত হয়েছিল। তিনি ‘পেনশন’ নামে একটি ছায়াছবিরও প্রযোজনা করেন। মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ১৯৮৫ সালে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
সুচিত্রা সেন
সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার অমত্মর্গত সেন ভাঙ্গাবাড়ী গ্রামে সুচিত্রা সেনের জন্ম। তিনি ছিলেন কবি  রজনীকান্ত সেনের নাতনী। পাবনা শহরে লেখাপড়া শিখে সুচিত্রা সেন কলকাতায় চলে যান এবং পরবর্তীকালে মনোমোহিনী চিত্র তারকা হিসাবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন।

হৈমন্তী শুকলা
সিরাজগঞ্জ শহরের কাসারিয়া পট্টিতে (বর্তমান মুন্সী মেহেরউল্লাহ সড়কে) হরিহর শুকলার ঔরষে হৈমমত্মী শুকলা জন্মগ্রহণ করেন। হরিহর শুকলা ছিলেন ছিলেন বৃটিশ আমলের একজন নামকরা গায়ক ও গানের ওসত্মাদ। যোগ্য পিতার যোগ্য মেয়ে হৈমমত্মী শুকলা আকাশবানীর নামকরা কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। তার বহু লং প্লে ডিস্ক রেকর্ড বাজারে বের হয়েছে। এই জনপ্রিয় কণ্ঠ শিল্পী হৈমমত্মী শুকলা বর্তমানে কলকাতার টালিগঞ্জে বসবাস করছেন।